রাজনীতির রঙিন প্রতিশ্রুতি বনাম জলাবদ্ধতার অভিশাপ

আবদুল কাদের খান

চীনের সর্বনাশা-সর্বগ্রাসী নদী ‘হোয়াংহোকে’ এক সময় ‘চীনের দুঃখ’ বলা হতো। আন্তরিক চেষ্টা চালিয়ে চীন সে দুঃখ জয় করেছে, সে অনেক কাল হলো! অথচ আমাদের দুঃখ দুঃখই রয়ে গেল! দীর্ঘ অর্ধশতাব্দী ধরে বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চলে যশোর জেলার কেশবপুর-মনিরামপুরের জলাবদ্ধ অঞ্চলে ‘ভবদহকে’ যশোরের দুঃখ বলা হতো। সে দুঃখ আজও রয়ে গেছে। তার বিন্দু মাত্র কোনো উন্নতি হয়নি। বোঝার উপর শাকের আটি হিসেবে যোগ হয়েছে আরেক দুঃখ, এর নাম বিল ডাকাতিয়া। ‘বিল ডাকাতিয়ার’ দুঃখের কিচ্ছা বাংলাদেশের সবাই গত ছয় দশক ধরে জানেন, কিন্তু প্রতিকারের পথ আটকে রয়েছে রহস্যের এক চোরাবালিতে। সত্যিই বিচিত্র এই দেশ! যশোরের ভবদহের পর এখন সেই দুঃখ ভর করেছে খুলনার উপর। খুলনার ডুমুরিয়ার ‘বিল ডাকাতিয়া’ এখন নিঃস্ব মানুষের আবাসভূমিতে পরিণত হয়েছে। খুলনা-যশোর অঞ্চলের বিল ডাকাতিয়ার জলাবদ্ধতা এখন এই অঞ্চলের হতভাগ্য কৃষিজীবী পরিবারের দুঃখ হিসেবে, ললাট লেখন হিসেবে, স্থায়ী হয়েছে।

যুগের পর যুগ ধরে মিথ্যা আশ্বাসের উপর চলে আসছে। কিন্তু মনিরামপুরের ‘ভবদহ’ কিংবা খুলনার ডুমুরিয়ার ‘বিল ডাকাতিয়া’র জলাবদ্ধতার কোনো স্থায়ী সমাধান হয়নি। জলবায়ু পরিবর্তন, অতি বৃষ্টির সর্বনাশা কুফল, হিসেবে এই অঞ্চলের হাজার হাজার কৃষিজীবী পরিবার সর্বস্ব হারিয়ে চরম দারিদ্র্যের নিম্ন সীমায় পৌঁছেছে। এ পর্যন্ত বহু প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে, পানি নিষ্কাশনের মাধ্যমে জলাবদ্ধতা নিরসনের জন্য, পানি উন্নয়ন বোর্ড, সরকারের দুর্যোগ মন্ত্রণালয়ের বড় বড় এক্সপার্টরা এলাকায় সরেজমিন পরিদর্শন করে, বহু প্ল্যান প্রোগ্রাম করেছেন! কিন্তু এই অঞ্চলের হতভাগ্য বাসিন্দাদের যে দুঃখ, সেই দুঃখই রয়ে গেছে!

একসময় এই অঞ্চল কৃষি অর্থনীতিতে অত্যন্ত সমৃদ্ধ ছিল, বিল ডাকাতিয়া অঞ্চলের মানুষ যোগাযোগ শিক্ষাব্যবস্থা সবদিক থেকে এগিয়ে এ জেলার অন্যতম জনপদে পরিণত হয়েছিল। কিন্তু এখন তা শতাব্দীকালের অভিশপ্ত একটি অবহেলিত অসহায় জনপদ। এ অঞ্চলে ঘুরলে মনে হয়, বিপন্ন হতভাগ্যদের দুর্দশা আর চোখের জলের হিসেব নেবার কেউ যেন নেই! ওই শতাব্দীর ষাটের দশক থেকে দীর্ঘ ছয় দশকের বেশি সময় ধরে যশোরের মনিরামপুরের ভবদহ এবং খুলনা ডুমুরিয়ার বিল ডাকাতিয়ার পানিবন্দি মানুষ আহাজারি করছে, জলাবদ্ধতার হাত থেকে নিষ্কৃতির জন্য অতীত থেকে শুরু করে বর্তমান সরকার সংশ্লিষ্ট অধিদপ্তরগুলোর শরণাপন্ন হয়েছে বহুবার বহুভাবে। তবে এ ব্যাপারে সমাধানের অংকটি একেবারে জিরো। স্বাধীন দেশের এই অঞ্চলের বাসিন্দারা এখন কি করবে ভেবে পাচ্ছে না এর কোনো প্রকৃত সমাধান। গাড়িতে চড়ে বড় কর্তারা এসেছেন। বহুদফা ইটিং-মিটিং এবং সিটিং হয়েছে অর্থাৎ খাওয়া বসা এবং বহু মতবিনিময় সভা হয়েছে। প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। এর মধ্য দিয়ে টাকা বরাদ্দ এবং কাজ হওয়ার পর বড় কর্তাদের পকেটে টাকা গেছে। ফাইল ওয়ার্ক সুচারুরূপে সম্পন্ন হয়েছে। কিন্তু কাগজে-পত্রে কাজ হলেও বাস্তবে কাজের কাজ কিছুই হয়নি।

কথায় বলে না, ‘ঘর পোড়া গরু সিঁদুরে মেঘ দেখলে ভয় পায়’ কি জানি আবার কোন দুর্যোগ নেমে না আসে, এবার তার জীবনকে তছনছ করে দেবে বা পুরোভাবে জীবনকে কেড়ে নেবে এই আতঙ্ক। অমনি দশা হয়েছে, খুলনার ডুমুরিয়ার বিল ডাকাতিয়া এলাকার হাজার হাজার পানিবন্দী অসহায় বিপন্ন চরম দরিদ্র দুর্দশাগ্রস্ত মানুষগুলোর, বিরতিহীন দুঃখবন্দী জীবনে। পরিবার-পরিজন নিয়ে বছরের পর বছর, মাসের পর মাস, দিনের পর দিন, যুগের পর যুগ চাতকের মতো সরকারি কৃপাদৃষ্টির দিকে তাকিয়ে আছে। কিন্তু ঔপনিবেশিক পাকিস্তান আমল থেকে বর্তমান বাংলাদেশের জীবনে প্রায় অর্ধ শতাব্দীর বেশি সময় ধরে তাদের দুর্দশার সামান্য কানা-কড়িও লাঘব হয়নি। বরং কয়েক ডিগ্রি বেড়েছে। বিরূপ জলবায়ুর প্রভাবে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষ, জলবন্দি লাখ লাখ পরিবার সরকারের সেচ, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, পানি উন্নয়ন বোর্ডসহ বহু মন্ত্রণালয়ের দ্বারস্থ হয়ে তাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেও গত ৬০/৭০ বছরে এ সমস্যার কোনো সুরাহা করতে পারেনি। সমস্যা যে তিমিরে, সেই তিমিরেই রয়ে গেছে! ঘটনাটি বড় বিস্ময়কর তাই না? এখন প্রশ্ন উঠেছে, বাংলাদেশের এই অঞ্চলের মানুষ আর কতকাল পানিবন্দি অবস্থায় ইতর জীবন যাপন করবে? আমার এ লেখা সরকারের সচিবরা, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয়ের বড় কর্তারা পড়বেন না, তাও জানি। তবুও নিজস্ব দায়িত্ববোধ থেকে লিখতে হলো। এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশের জাতীয় কবি, তৎকালীন ভারতে অবিভক্ত বাংলায় ভাঙা বাংলার রাঙা যুগের বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম-এর লেখা ঈষৎ পরিবর্তন করে লিখতে হলো।

‘যারা কেড়ে খায় ডুমুরিয়ার এই অঞ্চলের চার লক্ষ মানুষের মুখের গ্রাস/আমার রক্তলেখায় ওই পিশাচদের বিরুদ্ধে যেন লেখা হয় /চরম সর্বনাশ!’ এ ধরনের উদ্যত আচরণের জন্য পাঠকরা আমায় নিজ গুণে ক্ষমা করবেন।

আমার নিজ বাসভূমি জন্মস্থান ডুমুরিয়ার উত্তর অঞ্চলে অবস্থিত বিশাল এলাকা নিয়ে বিল ডাকাতিয়া। তারই দুঃখের রোজনামচা। বলাবাহুল্য, বিল ডাকাতিয়া অঞ্চলটি বাংলাদেশের পাবনার চলন বিল এলাকার পর এটি দ্বিতীয় কৃষি সমৃদ্ধ বিল অঞ্চল। ফসলের জন্য উর্বর এলাকা অথচ পানিবন্দী। আজ তা জলাবদ্ধতার শিকার। পানির নিচে জমে আছে কৃষিজীবী পরিবারের কয়েক যুগের দুঃখ যন্ত্রণা, নাজুক দারিদ্র্যের বেদনা করুণ পরিহাস!

গেল পাঁচই ডিসেম্বর ২০২৬ বাংলাদেশের এই অঞ্চলের অসহায় মানুষের বেদনার নালিশ গ্রহণের মুখপাত্র- ‘খুলনা গেজেট’ একটি মর্মস্পর্শী প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে, তার প্রথম পাতায় লিড নিউজ আকারে। যার পুরো কাহিনীটিতে এই অঞ্চলের পানিবন্দি মানুষের অসহায়ত্ব, দারিদ্র্য, বঞ্চনা আর চরম হতাশার চিত্র ফুটে উঠেছে।

খুলনা গেজেটের ডুমুরিয়া প্রতিনিধি সরেজমিন ঘুরে যে করুণ প্রতিবেদনটি লিখেছেন, তা যেকোনো সংবেদনশীল মানুষের অন্তরকে স্পর্শ না করে পারে না।

ওই প্রতিবেদক লিখেছেন –
‘কোটি কোটি টাকার খাল খনন প্রকল্পে সুফল মেলেনি/ বিল ডাকাতিয়ায় পানির নিচে সড়ক/ অনিশ্চয়তায় হাজারো মানুষ!’

তিনি লিখেছেন…
‘ডুমুরিয়ায় বিল ডাকাতিয়া অঞ্চলে জলাবদ্ধতা এখন এলাকাবাসীর কাছে এক ভয়াল দুর্যোগের নাম। এটি এখন জনজীবনে গলার কাঁটা হিসেবে বিঁধে আছে। টানা চার বছর ধরে পানিবন্দি জীবন কাটাচ্ছেন হাজার হাজার মানুষ। ইতোমধ্যে কোটি কোটি টাকা ব্যয় করে বিভিন্ন পদ্ধতিতে খাল খনন, উন্নয়ন প্রকল্প এবং নানা প্রতিশ্রুতির ফানুস উড়িয়েও জলাবদ্ধতার স্থায়ী সমাধান না হওয়ায় চরম ক্ষোভে ফুঁসছে এলাকাবাসী, অর্থাৎ বিল ডাকাতিয়ার অসহায় মানুষ। তাদের স্পষ্ট অভিযোগ, উন্নয়নের নামে রাষ্ট্রীয় অর্থ ব্যয় করে প্রকল্প হয়েছে, লোক দেখানো নামকাওয়াস্তে কাজও হয়েছে। কিন্তু এলাকাবাসীর অমান্য দুর্ভোগও কমেনি আজও বরং বিল ডাকাতিয়া ঘিরে শুরু হয়েছে রাজনৈতিক ছক্কা-পাঞ্জার আসর। সরেজমিন তদন্তে দেখা যায়, বারানসি থেকে কৃষ্ণনগর পর্যন্ত এলাকার জনযাতায়াতের প্রধান সড়কটি বছরের একটি বড় সময় ধরে পানির নিচে তলিয়ে থাকছে। ফলে মানুষের চলাচলের এখন একমাত্র ভরসা ডিঙ্গি নৌকা! জন প্রতি ১০ টাকা করে ভাড়া দিয়ে রাস্তার পাশের খাল পথে পানিবন্দি এলাকাবাসীর যাতায়াত করতে হচ্ছে। অসুস্থ রোগী, শিক্ষার্থী এবং কর্মজীবী মানুষ এই নাজুক অবস্থায় বেশি ভাবে, অহরহ দুর্ভোগের-দুর্যোগের শিকার হচ্ছে।’

‘এ ধরনের পরিস্থিতিতে এলাকাবাসীর ভাষ্য, এ বছর আষাঢ় মাস থেকে এ পর্যন্ত বৃষ্টি যা হয়েছে, তাতে পরিস্থিতি আরও নাজুক হয়েছে। ইতোমধ্যে, অনেক পরিবার নিজস্ব খরচে তাদের ভিটেবাড়ির ঘর উঁচু করায়, তাদের বাড়িঘর প্লাবিত না হলেও অধিকাংশ যাতায়াতের রাস্তা খালের উপর নির্মিত নিচু কালভার্টের কারণে ডিঙ্গি নৌকা সহ সব ধরনের নৌযান চলাচল দারুণভাবে ব্যাহত হচ্ছে। ফলে ওই এলাকার মানুষের বিপন্ন দশা কোনোভাবেই লাঘব হচ্ছে না।’

জলাবদ্ধতা নিরসনের জন্য বিল ডাকাতিয়ায় কোটি কোটি টাকার খাল খনন প্রকল্প নামকাওয়াস্তে সম্পন্ন করা হলেও প্রত্যাশিত সুফল তো মেলেনি, বরং প্রজেক্টের দায়িত্বপ্রাপ্তদের আখের গুছানোর কাজটি বেশ ভালোভাবেই হয়েছে। স্থানীয় এলাকাবাসীর অভিযোগ, আগে খনন করা খাল পুনরায় নামকাওয়াস্তে খননের চেয়ে মূল নদীগুলো গভীরভাবে খনন করা হলে, পানি নিষ্কাশন সহজ হতো, সেইসব পরামর্শ উপেক্ষা করে মতলববাজির মাধ্যমে হাত সাফাইভাবে প্রকল্পের কাজ সমাধা করা হয়েছে। ঘটনাটি স্থানীয় জনমনে বিরূপ প্রতিক্রিয়ার জন্ম দিয়েছে!

অভিযোগ রয়েছে, অপরিকল্পিত সিদ্ধান্ত, ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির কারণে প্রকল্প সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে। এমনকি এই প্রকল্পের জন্য ব্যবহৃত প্রায় এক কোটি ৩০ লাখ টাকা ঊর্ধ্বতন প্রশাসনের চাপে বাধ্যতামূলকভাবে সরকারি কোষাগারে জমা দিতে হয়েছে। এটা হচ্ছে প্রশাসনের দক্ষতার নমুনা! এখন বিল ডাকাতিয়া এলাকার মানুষেরা বলাবলি করছে, ভোটের আগে নেতারা যোগাযোগ ও পানি নিষ্কাশনের আকাশছোঁয়া রঙিন প্রতিশ্রুতি দিলেও এখন এই দুর্যোগে, কেউ আর আমাদের দিকে ফিরে তাকাচ্ছে না। বিল ডাকাতিয়াকে নিয়ে রাজনীতির জলাবদ্ধতার অভিশাপ চলছে যুগের পর যুগ ধরে। হাল আমলে ৪-৫ বছর যাবত এলাকার জলবন্দি মানুষের দুর্ভোগ মোটেও কাটছে না।

এ ধরনের নাজুক অবস্থায় এলাকাবাসীর প্রশ্ন, কোটি কোটি টাকার প্রকল্প যেখানে দুর্গত মানুষের দুর্ভোগ কমাতে পারেনি, তাহলে বিল ডাকাতিয়ার জলবন্দি মানুষের জীবনের অভিশাপ কী চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত পেতে চলেছে?

আমার কথা :
মন ভালো নয়, চোখ খোলা রাখি,
কি আর বলিব আমি! এলাকাবাসী আমার
এই লেখায় কোনো দৈন্যতা খুঁজে পেলে নিজ গুণে ক্ষমা করবেন।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক, সিনিয়র সাংবাদিক ও কলামিস্ট।

 

খুলনা গেজেট/এনএম




আরও সংবাদ

খুলনা গেজেটের app পেতে ক্লিক করুন